
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মহাপরিচালকের গাড়িচালক মোহাব্বতের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, গাড়িচালকের দায়িত্বে থাকলেও তিনি অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করছেন। একটি স্মারকের আওতায় ৩১ জন নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও তাদের মধ্যে ২০ জনের নিয়োগে তার সুপারিশ বা প্রভাব ছিল বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।
শুধু সুপারিশ বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগই নয়, চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী, সুপারিশ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র এবং আর্থিক লেনদেন তদন্ত করা প্রয়োজন।
৩১ জন নিয়োগ, ২০ জনের সুপারিশের অভিযোগ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, স্মারক নং ৩৩.০১.০০০০.১০১.১১.৯৩৯.২৫-১৭৮১-এর আওতায় মোট ৩১ জন নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, এদের মধ্যে ২০ জনের নিয়োগে মহাপরিচালকের গাড়িচালক মোহাব্বতের সুপারিশ বা প্রভাব ছিল।
এই অভিযোগ সত্য হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে একজন গাড়িচালক কীভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় এতটা প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পেলেন?
তিনি কি আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? কোনো নিয়োগ কমিটিতে তার দায়িত্ব ছিল কি না? তার সুপারিশ লিখিতভাবে করা হয়েছিল, নাকি মৌখিকভাবে? সংশ্লিষ্ট আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান তার সুপারিশ গ্রহণ করেছিল কি না এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
যাদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন অভিযোগের অনুসন্ধানে যেসব নাম সামনে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন স্বর্ণা খাতুন, পিতা মোঃ হোসেন আলী, দক্ষিণ কলমা, সাভার, ঢাকা; রিতা আক্তার, পিতা মোঃ আব্দুল মজিদ শেখ, রানিগ্রাস, বেড়া, পাবনা; সুনিতা কুমারী দাস, পিতা শ্যামাপদ দাস, কালিচরনপুর, ঝিনাইদহ; মোঃ রাব্বি, পিতা মোঃ বাছেদ মিঞা, ডেইরী ফার্ম, সাভার, ঢাকা; মোঃ মনিরুজ্জামান, পিতা মোঃ মোবারক হোসেন, পাচুড়িয়া, চাটমোহর, পাবনা; মোঃ মানিক হোসেন, পিতা মৃত মোঃ হাফিজুর রহমান, টুমাচর, লক্ষ্মীপুর সদর; মোঃ শহিদুল ইসলাম, পিতা হাজী আবু আলিম মিঞা, মামুদপুর, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ; মোঃ সামছুল হক, পিতা মোঃ ফজল হক, খেজুরো, সাভার, ঢাকা; দেওয়ান দিদারুল আরেফিন দ্বীপ, পিতা দেওয়ান মঞ্জুর আরেফিন, কুটুরিয়া, সাভার, ঢাকা; মোঃ হোসেন, পিতা মহরম আলী, বাটেরপাড়া, পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ; মোঃ রফিকুল ইসলাম আকাশ, পিতা মকবুল হোসেন, তুলসী, চাটখিল, নোয়াখালী; মোঃ সাজিদ হাসান, পিতা মোঃ মোশারফ হোসেন, দারুসা, পবা, রাজশাহী; মোঃ সজিব বাবু, পিতা মোঃ শফিকুল ইসলাম, ইসলামপুর, মিঠাপুকুর, রংপুর; মোছাঃ সাথী খাতুন, পিতা মোঃ খবর আলী মন্ডল, কুলশীবাস, কুমারখালী, কুষ্টিয়া; শ্রী বিজয় কুমার মন্ডল, পিতা শ্রী চারু চন্দ্র মন্ডল, রায়পাড়া, শাহ মখদুম, রাজশাহী; মোঃ আলমগীর, পিতা আবুল কালাম, পূর্ব এখলাসপুর, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর; আলমগীর কবির, পিতা মোকিত বিশ্বাস, দৌলতপুর, নড়াইল; এবং মোঃ সামছুল হক, পিতা ফজলুল হক, গেরুয়া, ডেইরী ফার্ম, সাভার, ঢাকা।
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের কারা কোন পদে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের যোগ্যতা কী এবং তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে মোহাব্বতের কোনো সুপারিশ বা ভূমিকা ছিল কি না তা সংশ্লিষ্ট নিয়োগ নথি যাচাই করেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
চাকরির নামে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা?
মোহাব্বতকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হচ্ছে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, আউটসোর্সিংয়ের বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা গেলে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। টাকা নগদে, ব্যাংকের মাধ্যমে নাকি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে দেওয়া হয়েছে—সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে, মোহাব্বতের ভাই, শালা এবং শালার ভাগ্নের ভায়রার স্ত্রীসহ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদেরও বিভিন্ন পদে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা বা প্রভাব ছিল।
তবে কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি মোহাব্বতের আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠজন এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে পারিবারিক সম্পর্ক, স্থায়ী ঠিকানা, নিয়োগের নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগ আমলেও অভিযোগের দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও মোহাব্বতের বিরুদ্ধে মাস্টাররোলে চাকরি দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগের পর তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে তিনি আবার সাভার ডেইরী ফার্মে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তার বদলির প্রকৃত কারণ কী ছিল, কতদিন তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন এবং কীভাবে বা কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আবার সাভারে ফিরে আসেন—এসব তথ্য সরকারি নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
হাইওয়ের জায়গায় দোকান বসানোর অভিযোগ মোহাব্বতের বিরুদ্ধে সাভার ডেইরী ফার্মে দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানের সামনের হাইওয়ের ফুটপাতের জায়গা ব্যবহার করে দোকান বসানো ও সেগুলো ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দোকান স্থাপনের অনুমোদন, সরকারি জায়গা ব্যবহারের বৈধতা, দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং ভাড়া বাবদ আদায় করা অর্থের হিসাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তদন্তেই মিলবে প্রকৃত চিত্র মোহাব্বতকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রথমেই স্মারক নং ৩৩.০১.০০০০.১০১.১১.৯৩৯.২৫-১৭৮১-এর আওতায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৩১ জনের পূর্ণাঙ্গ নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ২০ জনের নিয়োগে কার সুপারিশ ছিল, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণীতে কী আছে, কোন কর্মকর্তা অনুমোদন দিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী ছিল এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে মোহাব্বতের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এসব বিষয় তদন্ত করা দরকার।
একই সঙ্গে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেনসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য পরীক্ষা করা যেতে পারে।
দুদক ও অধিদপ্তরের তদন্ত দাবি গাড়িচালকের বিরুদ্ধে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আউটসোর্সিং নিয়োগে প্রভাব বিস্তার, ২০ জনের নিয়োগে সুপারিশ, স্বজনপ্রীতি এবং লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দায়মুক্তি দুই ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রকাশ করা হবে মোহাব্বতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা জরুরি। একইভাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কমিটি এবং আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যও নেওয়া প্রয়োজন।
মোহাব্বত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। একজন গাড়িচালকের বিরুদ্ধে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আউটসোর্সিং নিয়োগে এত বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার, ৩১ জনের মধ্যে ২০ জনের নিয়োগে সুপারিশ এবং চাকরির নামে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠলে—এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল?
নিয়োগের ফাইল, সুপারিশ, অনুমোদন ও আর্থিক লেনদেনের নথি কি খতিয়ে দেখা হবে?
নাকি গুরুতর এসব অভিযোগও সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যাবে?
এখন সেই প্রশ্নের উত্তরই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
⏳ জাদুকরী উপায়ে কার্ডটি ফুল এইচডিতে রেন্ডার হচ্ছে, একটু অপেক্ষা করুন...

